‘শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজন’, প্রাক্তন তৃণমূল সরকার ও কংগ্রেসকে নিশানায় বিরাট বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় একের পর এক দুর্নীতি। ভেঙে পড়েছিল পরিকাঠামো। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। জেলেও যেতে হয়েছিল তাকে। এসএসসি দুর্নীতি কারুর অজানা নয়। তৎকালীন তৃণমূল সরকারের দিকে আঙুল দিনের পর দিন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে গেছেন তারা। কোনও সুরাহা নেই। এমনকি আন্দোলনকারীদের কপালে জুটে ছিল পুলিশি হেনস্থা।
এবার সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করতে অগ্রণীর ভূমিকা নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আজ ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার নিউটাউনের কনভেনশন সেন্টারে বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। এদিন মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানান, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দকে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রথমে রাধাকৃষ্ণণ সম্পর্কে বলতে হবে। তাঁর জন্মদিনে শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। বিদ্যাসাগর তিনশোর বেশি বই লিখে গিয়েছেন। সব থেকে বেশি করেছেন নারী শিক্ষা প্রসারে। তিনি যে সংস্কার করে গিয়েছেন, তা আজকের দিনের জন্য প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি।
শিক্ষা কেমন হওয়া উচিত, বলে গিয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর লেখা বই পড়ার সুযোগ হয়েছে। বেলুড় মঠ ও মিশনে একাধিক বই সংগ্রহ করেছি। শিক্ষা সম্পর্কে যে কথা বলেছেন, তা আজকের দিনে ভীষণ প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, এমন শিক্ষা চাই, মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিবাদ বিকশিত হয়, বুদ্ধিবৃত্তি বিকশিত হয়। তাই পুঁথিগত শিক্ষার মধ্যে যদি আটকে রাখি, তাহলে ভুল করব। এদিন মুখ্যমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক ভুল করে ফেলেছি। ব্রতচারীর মতো শরীর গঠন ফিরিয়ে আনার দরকার আছে। আমাদের এখানে এনসিসি তুলে দেওয়া হল। জয় হিন্দ বাহিনী তৈরি করা হল। ভীষণ ক্ষতি হয়েছে। এনসিসি-কে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমরা খেলাধূলার প্রতি নজর দিইনি। আমি মনে করি, প্রত্যেকটি বিদ্যালয় আমি যে জেলা মেদিনীপুর থেকে উঠে এসেছি, সেই জেলা মাধ্যমিকে শতাংশের বিচারে সবসময় প্রথম স্থান হিসেবে উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের ওই জেলায় ময়না বলে একটা জায়গা রয়েছে। সেখানে আপনি যদি বিদ্যালয়গুলিতে যান, সেই পুরনো লোকেদের তৈরি করা ভাবনায় বড় বড় জমি দিয়ে গিয়েছেন। একেকটা বিদ্যালয়ে প্রেয়ার হল, বিরাট খেলার মাঠ, সাঁতার কাটার জন্য পুকুর, কী নেই সেখানে। ঢুকলেই একটা শান্ত পরিবেশ। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি, আরেকদিকে বিদ্যাসাগর আবার কোথাও রয়েছে মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি। হলগুলিতে রবীন্দ্র চর্চা। যতরকমের শারীরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল। এগুলো অবহেলিত হয়েছে। এগুলো আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে।
এদিন মোবাইলের কুপ্রভাব নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। গুজরাটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গুজরাটে ক্লাস ওয়ান থেকে ১২ ক্লাস পর্যন্ত মোবাইলে হাত দিতে দেওয়া হয় না ছাত্র-ছাত্রীদের। এইসব সংস্কার না করলে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক দিবসের মানে থাকবে না। কিছু জিনিস রয়েছে যার রাজনীতির লোকেদের ঢোকা উচিত নয়।
মুখ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় বলেন, একটা বিষয় কম্প্রোমাইজ করা উচিত নয়। যাঁরা রাষ্ট্রের ভিতরে থেকে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে, দেশপ্রেমের প্রশ্ন তোলে, পূর্ণাঙ্গ বন্দে মাতরম গানে সমস্যা থাকে, যারা পহেলগাম আক্রমণ হলে প্রতিবাদ করে না অথচ পাকিস্তানের আক্রমণের প্রশ্ন তোলে। তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষাসমাজ, রাষ্ট্রবাদী, নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশটা আমাদের কত বড়ো ছিল ধীরে ধীরে কাটতে কাটতে ছোট হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এদিন ফের শোনা যায় সিলেবাসের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, টাটাকে তাড়ানোর বিষয়টা নিয়ে এক পাতা রয়েছে। আর স্বামী প্রবণানন্দ নিয়ে একটি লাইনও থাকবে না। শাম্যাপ্রসাদ কীভাবে বাংলাকে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, আপনি জানাবেন না নতুন প্রজন্মকে? মাতঙ্গিনী হাজরাকে নিয়ে পুরো পেজ থাকবে না। বন্দে মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছি। কিছু জিনিসে সরকার কঠোর থাকবে। কিছু জিনিসের কম্প্রোপ্রাইজ করবে না সরকার। নানা সংস্কার করতে করতে এগোব।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী দুটি প্রকল্পের ঘোষণা করেন। প্রতি জেলায় দু’টি করে তৈরি হবে সিএমশ্রী ইনস্টিটিউট। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী শ্রী। জহর নবোদয় বিদ্যালয়ের মতো এগুলিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি করা হবে। এগুলোকে পরিণত করা হবে মডেল স্কুলে। সেরা মানের শিক্ষক, আধুনিক ডিজিট্যাল ল্যাব ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট করে ধরে নিতে পারেন সেন্ট্রাল স্কুল তৈরি করব। সেইসঙ্গে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে সেন্টার অফ এস্কিলেন্স অফ স্পোর্টস। স্পোর্টসের ক্ষেত্রে দু’টি পরিকাঠামোগত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব। সেখানে এসএসসির মাধ্যমে স্পোর্টসের শিক্ষকদের নিয়োগ করা হবে। আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগামিদিনে যাতে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে থেকে ভবিষ্যত তৈরি হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁরা অংশগ্রহণ করে, সেই ব্যবস্থাও করব। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের প্রাচীনতম খেলাধুলো, খোখো, হাডুডু, ফুটবল ইত্যাদি খেলাধুলো প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে ফিরে আসুক।