চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু শ্রীপর্ণার, স্মৃতি আঁকড়ে শোকে পাথর মা
সুশোভন বন্দ্যোপাধ্যায়, হুগলি
উমা ঘরে ফিরেছেন, কিন্তু ফেরা হল না শ্রীপর্ণার। শাস্ত্রমতে একাদশীতে দুর্গার বিদায়ের পর আগামী বছরের অপেক্ষা শুরু। কিন্তু বৈদ্যবাটির মালির বাগানের পোদ্দার বাড়িতে আর কোনও প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা নেই। সপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগানে ঠাকুর দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৬ বছরের নার্স শ্রীপর্ণা পোদ্দারের। কয়েক দিন পরেও মেয়ের মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না মা স্বপ্না পোদ্দার।
ঘরে ঢোকার মুখে মেয়ের ছবি। বারবার তার সামনে বসে অ্যালবাম থেকে বের করছেন শ্রীপর্ণার আঁকা ছবিগুলি। নিউ টাউনের টাটা ক্যান্সার হাসপাতালের রোবোটিক সার্জারি বিভাগে কর্মরত শ্রীপর্ণা বেনারসের সন্ধ্যা আরতির একটি বড় ক্যানভাস আঁকছিলেন। হস্টেলে অবসর পেলেই একটু একটু করে আঁকতেন। পুজোয় বাড়ি ফিরে সেই ছবি মাকে উপহার দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অসম্পূর্ণ ছবির মতোই অপূর্ণ রয়ে গেল মায়ের সেই সারপ্রাইজ।
স্বপ্নাও একসময় নার্স ছিলেন। তিন বছর আগে অবসর নিয়েছেন। বাবা কাপড়ের ব্যবসায়ী। সপ্তমীর সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টা নাগাদ চোরবাগানের মণ্ডপের লাইনে দাঁড়িয়েই মাকে শেষবার ফোন করেছিলেন শ্রীপর্ণা। বলেছিলেন, ট্রেনে উঠে জানাবেন। বাবা স্টেশনে আনতে যাবেন, এমনটাই ঠিক ছিল। তার পরেই এল মেয়ের মৃত্যুসংবাদ।
বাড়ির পোষ্য পপি যেন বুঝতে পেরেছে, তার প্রিয় মানুষটি আর ফিরবে না। শ্রীপর্ণা বাড়ি ফিরলেই পপির জন্য মিষ্টি আনতেন, নিজের হাতে খাওয়াতেন, আদর করতেন। এখন চার দিন ধরে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দরজার সামনে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে সে।
শাড়ি পরতে ভালোবাসতেন শ্রীপর্ণা। পুজোয় মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করে ছ'টি নতুন পোশাকও কিনেছিলেন। স্বপ্নার কথায়, “সকালে মেয়েকে সাজিয়ে পাঠালাম, সন্ধ্যায় আর ওকে দেখার মতো পরিস্থিতি ছিল না। এখন আর কেউ বলে না, মা তুমি কী খেয়েছো, কী নেবে। ঠাকুরের কাছে একটাই প্রার্থনা, এত মানুষের কোল খালি হওয়াটা যেন আর কখনও না হয়।”
একটি মৃত্যু শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, নিঃস্ব করেছে এক মাকে, স্তব্ধ করেছে এক পরিবারকে। আর দরজায় অপেক্ষারত পপি আজও জানে না, তার দিদি আর কোনও দিন ফিরবে না।