ব্রেকিং

বাঘের হাত থেকে বাঁচতে মাতৃ আরাধনা! আজও অমলিন শতাব্দী প্রাচীন কালীমন্দিরের ঐতিহ্য

Monday, 2 November 2026 at 13:27 Superadmin
Share
বাঘের হাত থেকে বাঁচতে মাতৃ আরাধনা! আজও অমলিন শতাব্দী প্রাচীন কালীমন্দিরের ঐতিহ্য

শুভজিৎ দাস, সাগরদ্বীপ: 


ভৌগোলিক পরিবর্তনের হাত ধরে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল এক দ্বীপ। কালক্রমে সেই দ্বীপই পরিচিতি পায় সাগরদ্বীপ নামে। একসময় ঘন অরণ্যে ঢাকা ছিল বিস্তীর্ণ এলাকা। জঙ্গলের গভীরে ছিল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অবাধ বিচরণ। জীবিকার টানে সুন্দরবনের উপকূলবর্তী এলাকা থেকে মানুষজন সেই অরণ্যে আসতেন কাঠ ও মধু সংগ্রহ করতে। বিপদসংকুল জঙ্গলে হিংস্র বন্যপ্রাণীর আতঙ্ক থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রার্থনায় এক বটগাছের তলায় শুরু হয়েছিল মা কালীর আরাধনা। সময়ের স্রোতে বদলেছে দ্বীপের চেহারা, জঙ্গল কেটে গড়ে উঠেছে জনবসতি। কিন্তু হারিয়ে যায়নি সেই আরাধনা। বটতলার সেই পুজোই আজ সাগরদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী ধসপাড়া আদিকালী মন্দির। আসন্ন কালীপুজোকে ঘিরে বর্তমানে এই প্রাচীন মন্দিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সংস্কার, আলোকসজ্জা ও পুজোর আয়োজন ঘিরে মন্দির চত্বরে এখন সাজ সাজ রব।

মন্দির কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাগরদ্বীপে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার আদিপর্ব থেকেই এই মন্দিরে মা কালীর আরাধনা চলে আসছে। মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাড়ে চারশো বছরের ঐতিহ্যের দাবি। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুজোর প্রাচীন ধারাকে ঘিরে রয়েছে নানা কাহিনি। কথিত আছে, অরণ্যে কাঠ ও মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়তেন কাঠুরেরা। সেই বিপদ থেকে মুক্তি এবং নিরাপত্তার আশায় তাঁরা বটগাছের তলায় শুরু করেন দেবীর আরাধনা। পরবর্তীকালে সেই বটতলার পুজোই ধীরে ধীরে মন্দিরের রূপ নেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আজও বহমান সেই পুজোর ধারা।

বর্তমানে ধসপাড়া আদিকালী মন্দিরে রয়েছে দেবীর পাঁচটি বড় মূর্তি। পাশাপাশি রয়েছে আরও বহু ছোট ছোট কালীমূর্তি। ভক্তরা মানত করে এই মূর্তিগুলি মন্দিরে দিয়ে গিয়েছেন। সেই থেকেই সমস্ত মূর্তিতে পুজো হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন পুরোহিত। নিত্যপুজোর পাশাপাশি প্রতি মঙ্গল ও শনিবার মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। এই দুই দিনে কয়েকশো পুণ্যার্থীর সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। শুধু সাগরদ্বীপ নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও ভক্তরা মায়ের দর্শন ও পুজো দিতে ছুটে আসেন।

কালীপুজোর দিন মন্দিরে বিশেষ আয়োজন করা হয়। সেই উপলক্ষেই এখন জোরকদমে চলছে প্রস্তুতি। মন্দির সংস্কার, জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা এবং পুজোর যাবতীয় আয়োজন নিয়ে ব্যস্ততা তুঙ্গে। মন্দির প্রাঙ্গণকে নতুন সাজে সাজিয়ে তুলতে তৎপর সেবায়েত ও সংশ্লিষ্টরা। কার্তিক মাসের অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বাড়তি উৎসাহ। প্রাচীন এই তীর্থক্ষেত্রকে ঘিরে এলাকায় এখন উৎসবের আবহ।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুজোর কিছু রীতি। একসময় পুরোহিতহীন স্বহস্তে পুজোর প্রাচীন প্রথা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। অতীতের পশুবলি প্রথাও বর্তমানে বন্ধ। এখন সাত্ত্বিক উপায়েই মায়ের আরাধনা হয়। তবে পুজোর রীতিতে পরিবর্তন এলেও মন্দিরের ঐতিহ্য ও ভক্তদের বিশ্বাস আজও অমলিন।

মন্দিরের প্রধান সেবায়েত প্রকাশ পণ্ডা বলেন, 'সাগরদ্বীপ যখন থেকে গড়ে উঠেছিল, তারপর থেকেই এই মন্দিরে কালীমায়ের পুজো শুরু হয়। আমাদের পূর্বপুরুষ দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দিরে মায়ের সেবা করে আসছেন। বংশপরম্পরায় এখন আমি প্রধান সেবায়েত। এই মন্দিরের মা খুবই জাগ্রত। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ পুজো দিতে আসেন। মা করুণাময়ী, সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন।'

ভক্ত গীতা পতি জানান, মায়ের মহিমা অসীম। সেই বিশ্বাস থেকেই ভক্তরা বারবার মায়ের কাছে ছুটে আসেন। 

অন্যদিকে, মন্দির কমিটির সদস্য উৎপল প্রামাণিক জানান, ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে মানুষ যখন গঙ্গাসাগর দ্বীপে বসতি গড়ে তুলতে শুরু করেন, তখন থেকেই এই কালীমন্দিরের সঙ্গে এলাকার মানুষের সম্পর্ক। মায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাসই আজও বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে এখানে টেনে আনে।

ভৌগোলিক পরিবর্তনে জন্ম নেওয়া দ্বীপের বুকে বটতলার এক প্রাচীন আরাধনা আজও বহন করে চলেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের উত্তরাধিকার। কালীপুজোর প্রাক্কালে সেই ঐতিহ্যকে ঘিরেই আলোয়, ভক্তিতে ও উৎসবের আবহে নতুন করে সেজে উঠছে সাগরদ্বীপের ধসপাড়া আদিকালী মন্দির।