সিঁদুরের রাঙা আবিরে বিদায় উমার, উৎসবের উচ্ছ্বাসে মিশল বিষাদের সুর
অনুসূয়া সিনহা, পশ্চিম বর্ধমান:
ঢাকের বোল, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির আবহে লাল সিঁদুরে রঙিন হয়ে উঠল আসানসোল শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গাপুজো মণ্ডপ। বিজয়া দশমীর সকালে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর চিরাচরিত আচার ঘিরে উৎসবের আবেগে ভাসলেন মহিলারা। আসানসোল থেকে কুলটি, বরাকর, রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, বারাবনি, সালানপুর ও রূপনারায়ণপুর—শিল্পাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পালিত হল বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। তবে লাল সিঁদুরের রঙে আনন্দের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়লেও, উমার বিদায়লগ্নে অনেকের চোখের কোণে জমেছিল বিষাদের জল।
প্রথা মেনে দশমীর সকালে বিভিন্ন মণ্ডপে দেবী দুর্গাকে সিঁদুর পরিয়ে, পান ও মিষ্টি নিবেদন করে বরণ করেন বিবাহিত মহিলারা। সংসারের সুখ-শান্তি, পরিবারের মঙ্গল ও সমৃদ্ধি কামনায় দেবীর চরণে প্রার্থনা জানান তাঁরা। এরপর শুরু হয় সিঁদুর খেলার পর্ব। একে অপরের কপালে ও মুখে সিঁদুর মাখিয়ে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মহিলারা। কারও হাতে শঙ্খ, কারও কণ্ঠে উলুধ্বনি—আনন্দ, আবেগ আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে মুখর হয়ে ওঠে পুজো প্রাঙ্গণ।
শিল্পাঞ্চলের একাধিক মণ্ডপে এদিন ধরা পড়ে বাঙালির চিরপরিচিত দশমীর ছবি। নতুন শাড়িতে সেজে, একে অপরকে আলিঙ্গন করে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন মহিলারা। উৎসবের এই বিশেষ মুহূর্ত স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে অনেককেই দেখা যায় ছবি ও ভিডিও তুলতে। পুজো কমিটির সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় মিলনোৎসবের আবহ।
সিঁদুর খেলা কেবল একটি ধর্মীয় রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির সামাজিক ঐতিহ্য, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও আবেগের নিবিড় বন্ধন। বছরের এই বিশেষ দিনে পরিচিত-অপরিচিতের ভেদরেখা মুছে গিয়ে মহিলারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নেন আনন্দের মুহূর্ত। দেবীকে বরণ করার মধ্য দিয়ে তাঁরা কামনা করেন সংসারের কল্যাণ ও আগামী দিনের মঙ্গল।
কিন্তু উৎসবের রঙিন আবহের আড়ালেই এদিন বারবার ফিরে এসেছে বিদায়ের বিষণ্ণতা। চার দিনের আনন্দযজ্ঞ শেষে এবার কৈলাসের পথে পাড়ি দেবেন উমা। যে মণ্ডপ কয়েক দিন ধরে আলো, সাজসজ্জা আর ভক্তির আবেশে প্রাণবন্ত ছিল, সেখানে নেমে আসবে অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর। তাই সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠার পাশাপাশি দেবীর সামনে নতজানু হয়ে আগামী বছর আবার ফিরে আসার প্রার্থনা জানিয়েছেন ভক্তরা।
লাল সিঁদুরে রাঙা মুখ, হাসি-আলিঙ্গন আর চোখের কোণে জমে থাকা জল—সব মিলিয়ে বিজয়া দশমীতে আসানসোল শিল্পাঞ্চল সাক্ষী থাকল বাঙালির চিরন্তন আবেগের। আনন্দের সঙ্গে বিষাদকে বুকে নিয়েই এদিন সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হল একটাই প্রত্যাশা—‘আসছে বছর আবার হবে, উমা আবার ফিরে আসবে।’