ব্রেকিং

সিন্ধু সভ্যতার ঐতিহ্যে দেবী দুর্গা! ডোকরা শিল্পের ছোঁয়ায় নজর কাড়বে পুরাতন বাজার সর্বজনীন

Wednesday, 21 October 2026 at 01:08 Superadmin
Share
সিন্ধু সভ্যতার ঐতিহ্যে দেবী দুর্গা! ডোকরা শিল্পের ছোঁয়ায় নজর কাড়বে পুরাতন বাজার সর্বজনীন

শুভজিৎ দাস, ডায়মন্ড হারবার:


প্রাচীন ভারতের শিল্পঐতিহ্য, ধাতুর কারুকাজ আর বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। এই তিনের মেলবন্ধনে এবার দর্শকদের সামনে নতুন চমক নিয়ে হাজির পুরাতন বাজার সর্বজনীন। চার হাজার বছরের প্রাচীন ডোকরা শিল্পকে কেন্দ্র করে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে পুজোর মণ্ডপ। 

‘ধরিত্রী ও ধাতু’—এই বিশেষ ভাবনাকে সামনে রেখে ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, ঐতিহ্য ও লোকশিল্পের ইতিহাসকে তুলে ধরার পরিকল্পনা নিয়েছে পুজো উদ্যোক্তারা। পুরাতন বাজার সর্বজনীনের এবারের দুর্গাপুজো ৬১তম বর্ষে পদার্পণ করছে। উদ্যোক্তাদের আশা, শিল্পের অভিনব উপস্থাপনা দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠবে।

ভারতের প্রাচীন শিল্পকলার অন্যতম নিদর্শন ডোকরা শিল্প। ধাতুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শিল্পের ইতিহাস বহু প্রাচীন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই শিল্পের শিকড় সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পগুলির মধ্যে ডোকরা শিল্পের বিশেষ স্থান রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পীরা নিজেদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। শুধু বাংলাতেই নয়, দেশ-বিদেশের শিল্পপ্রেমীদের কাছেও ডোকরা শিল্পের যথেষ্ট কদর রয়েছে।

ডোকরা শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মোমের ছাঁচে ধাতু ঢালাইয়ের বিশেষ পদ্ধতি, যা ‘লস্ট-ওয়াক্স কাস্টিং’ নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে প্রথমে মোম দিয়ে কাঙ্ক্ষিত অবয়ব তৈরি করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সেই ছাঁচের সাহায্যে ধাতব সামগ্রী তৈরি করা হয়। শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধাতুর বুকে ফুটে ওঠে নানা নকশা, জীবজন্তুর অবয়ব, দেবদেবীর মূর্তি, অলংকার এবং বিভিন্ন নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী। যন্ত্রনির্ভর উৎপাদনের বাইরে শিল্পীর নিজস্ব সৃজনশীলতা ও পরিশ্রম এই শিল্পকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

এবার সেই শিল্পকেই দুর্গাপুজোর মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে নতুনভাবে তুলে ধরতে চাইছেন পুরাতন বাজার সর্বজনীনের উদ্যোক্তারা। ‘ধরিত্রী ও ধাতু’ ভাবনার মধ্য দিয়ে প্রকৃতি, মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং প্রাচীন ধাতুশিল্পের ঐতিহ্যকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করা হচ্ছে। মণ্ডপের সাজসজ্জায় ধাতুশিল্পের বিভিন্ন রূপ ও কারুকাজের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হবে ঐতিহ্যের নানা দিক। দুর্গাপুজোর মতো বৃহৎ সামাজিক উৎসবের মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে প্রাচীন শিল্পকলার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বর্তমান সময়ে আধুনিকতার দাপটে বহু প্রাচীন লোকশিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ডোকরা শিল্পকে পুজোর থিমের মাধ্যমে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর ফলে দর্শনার্থীরা যেমন শিল্পের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন, তেমনই জানতে পারবেন এর ইতিহাস ও নির্মাণশৈলী সম্পর্কে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে বলেও আশা উদ্যোক্তাদের।

পুরাতন বাজার সর্বজনীনের এবারের পুজোর আনুমানিক বাজেট প্রায় ৯ লক্ষ টাকা। পুজো কমিটির সম্পাদক অরিজিৎ মণ্ডল জানান, প্রাচীন শিল্পঐতিহ্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই ভাবনাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ডোকরা শিল্পের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যকে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ৬১তম বর্ষে পুরাতন বাজার সর্বজনীনের দুর্গাপুজো শুধুমাত্র দেবী আরাধনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং প্রাচীন ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরার এক বিশেষ মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে। ধাতুর বুননে ইতিহাসের ছোঁয়া আর শিল্পের কারুকাজে মাতৃবন্দনা—এই দুইয়ের মেলবন্ধন কতটা নজর কাড়ে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দর্শনার্থীরা।