ব্রেকিং

ঐতিহ্যের আঙিনায় ১৭৫ বছরের শারদোৎসব! আজও অমলিন মাহাতা পরিবারের বনেদিয়ানা

Tuesday, 20 October 2026 at 22:30 Superadmin
Share
ঐতিহ্যের আঙিনায় ১৭৫ বছরের শারদোৎসব! আজও অমলিন মাহাতা পরিবারের বনেদিয়ানা

অনুসূয়া সিনহা,পশ্চিম বর্ধমান:

 

কালের অমোঘ নিয়মে বদলে গিয়েছে সমাজের রীতিনীতি। আধুনিকতার স্পর্শে রূপান্তরিত হয়েছে উৎসবের উদ্‌যাপন। কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের শিকড় যে এত সহজে উপড়ে ফেলা যায় না, তারই জীবন্ত নিদর্শন সালানপুর ব্লকের ডাবরগ্রামে মাহাতা পরিবারের দুর্গাপুজো। প্রায় ১৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই শারদোৎসব আজও বহন করে চলেছে বনেদিয়ানা, পারিবারিক ঐক্য এবং প্রাচীন সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার।

স্থানীয় ইতিহাস ও পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী, প্রায় ১৭০ থেকে ১৭৫ বছর আগে তৎকালীন কুলটি ব্লকের অন্তর্গত ডাবরগ্রামে এই দুর্গোৎসবের সূচনা করেন দীনবন্ধু মাহাতা। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাধক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁর হাত ধরে যে পুজোর পথচলা শুরু হয়েছিল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আজও সেই ঐতিহ্যকে সযত্নে লালন করে চলেছে মাহাতা পরিবার। সময়ের ব্যবধানে এই পুজো আর নিছক পারিবারিক আরাধনার পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই, তা পরিণত হয়েছে গোটা গ্রামের আবেগ, গর্ব ও সম্প্রীতির অন্যতম কেন্দ্রে।

জীবিকার সন্ধান, পড়াশোনা কিংবা কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা ছড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু শারদীয়ার আগমনী সুর বেজে উঠতেই যেন ছিন্ন দূরত্বের সব ব্যবধান মুছে যায়। দুর্গাপুজোর চারটি দিন পরিবারের সদস্যদের মিলনমেলায় পরিণত হয় ডাবরগ্রামের মাহাতা বাড়ি। প্রবীণদের স্নেহচ্ছায়া আর নবীনদের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে বাড়ির প্রতিটি কোণ। আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, হাসি-আড্ডা এবং পারস্পরিক ভালোবাসায় উৎসবের আবহ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।

এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পরিবারের সকল সদস্যের একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজনের দীর্ঘদিনের রীতি। পুজোর প্রতিটি দিন একই ছাদের তলায় বসে এক পঙ্‌ক্তিতে আহার গ্রহণের মধ্য দিয়ে যেন নতুন করে উদ্‌যাপিত হয় বংশের ঐক্য ও আত্মীয়তার বন্ধন। প্রজন্মের পরিবর্তন ঘটলেও এই প্রথার ধারাবাহিকতা আজও অক্ষুণ্ণ।

প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিষ্ঠাভরে সম্পন্ন হয় দেবীর আরাধনা। অঞ্জলি, আরতি, ঢাকের বাদ্যি এবং ধুনুচি নাচে মুখরিত হয়ে ওঠে পুজো প্রাঙ্গণ। আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও পুরনো পরম্পরাকে আঁকড়ে ধরে এই পুজো মনে করিয়ে দেয়, উৎসবের প্রকৃত মাহাত্ম্য কেবল আড়ম্বরের মধ্যে নয়, নিহিত রয়েছে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও মানুষের পারস্পরিক বন্ধনে।

ডাবরগ্রামের মাহাতা পরিবারের এই দুর্গোৎসব তাই কেবল একটি বনেদি পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতিচ্ছবি। প্রায় পৌনে দুই শতাব্দীর এই পথচলা প্রমাণ করে আন্তরিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন থাকলে সময়ের পরিবর্তনও মানুষের শিকড়কে মুছে দিতে পারে না। সেই গৌরবময় উত্তরাধিকারকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়েই আজও দেবী দুর্গার আবাহনে মেতে ওঠে ডাবরগ্রামের মাহাতা পরিবার।