শরীরের অস্বাভাবিক গঠন, সঙ্গে একাধিক রোগ! কঠিন চ্যালেঞ্জ জিতে সাফল্য পুরুলিয়া মেডিক্যালের
পিউ নন্দী, পুরুলিয়া: শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক অবস্থানের ঠিক বিপরীতে। তার উপর পিত্তথলিতে সংক্রমণ, জমে থাকা পুঁজ এবং মুখে আটকে থাকা প্রায় ২ সেন্টিমিটার পাথর। সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো একাধিক শারীরিক সমস্যা। এমন জটিল পরিস্থিতিতেও সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ৫৫ বছরের এক মহিলাকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরালেন পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকরা। স্বল্প ক্ষত পদ্ধতিতে সম্পন্ন এই অস্ত্রোপচার চিকিৎসকদের কাছে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
বাঘমুন্ডির গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রমিলা মাঝি পেটে ব্যথা নিয়ে কয়েক মাস আগে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানতে পারেন, তাঁর শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্বাভাবিক অবস্থানের বিপরীতে রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই বিরল অবস্থাকে বলা হয় ‘সাইটাস ইনভার্সাস টোটালিস’। সাধারণত শরীরের অঙ্গগুলির অবস্থান সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে এই গঠনের পার্থক্য থাকায় রোগ নির্ণয় এবং অস্ত্রোপচার—দুই ক্ষেত্রেই বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
পরীক্ষায় আরও ধরা পড়ে, রোগীর পিত্তথলিতে গুরুতর সংক্রমণ হয়েছে। পিত্তথলির মুখে আটকে ছিল প্রায় ২ সেন্টিমিটার আকারের একটি পাথর। ভিতরে জমেছিল পুঁজও। তার সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতা অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
হাসপাতালের শল্য চিকিৎসক পবন মণ্ডল জানান, রোগ নির্ণয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকদের সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। তবে ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেও তাঁরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। অস্ত্রোপচারের আগে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। এরপর পবন মণ্ডল ও মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দল অস্ত্রোপচারে হাত দেয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে সেই জটিল প্রক্রিয়া।
সার্জিক্যাল টিমে চিকিৎসকদের পাশাপাশি ছিলেন মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান প্রিয়ন্তন বেজ, শেখ সোহেল, মনিকা মাহালি, অঞ্জলি কর্মকার ও মনিকা গড়াই। অ্যানাস্থেশিয়া বিভাগের সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন প্রমিলা মাঝি। তাঁকে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এখনও চলছে।
প্রান্তিক জেলার সরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমন বিরল শারীরিক গঠন এবং একাধিক শারীরিক জটিলতা সামলে অস্ত্রোপচারের সাফল্য নিঃসন্দেহে চিকিৎসক দলের কাছে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে এই ঘটনা আবারও সামনে আনল, উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে জেলা স্তরের সরকারি হাসপাতালগুলির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।